Home শিক্ষাইতিহাস ইতিহাসের সাথে ভূগোলের সম্পর্ক আলোচনা কর

ইতিহাসের সাথে ভূগোলের সম্পর্ক আলোচনা কর

by Rezaul Karim
ইতিহাসের সাথে ভূগোলের সম্পর্ক

ইতিহাসের সাথে ভূগোলের সম্পর্ক

ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞান এবং ইতিহাস ও অর্থনীতির সাথে যেরূপ সম্পর্ক বিদ্যমান কার্যত ইতিহাস ও ভূগোলের মধ্যকার সম্পর্ক তার চেয়েও ঘনিষ্ঠ। কার্যত সুনির্দিষ্ট ভৌগোলিক অবস্থান ব্যতীত কোন ঐতিহাসিক ঘটনা ও কার্যক্রম সংঘটিত হওয়া সম্ভব নয়। ইতিহাসের পাতায় স্থান লাভকারী সকল সভ্যতা, বিবর্তন, পরিবর্তন, ঘটনা, চুক্তি, যুদ্ধ, সম্মেলন প্রভৃতি যাবতীয় সকল কিছুই কোন না কোন ভৌগোলিক অঞ্চলের ব্যাপার।

ইতিহাসের মূল উপজীব্য মানুষ, তার সমাজ ও সভ্যতা। ভূগোলের মূল উপজীব্য ভূ-প্রকৃতি পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে নদনদী, জলবায়ু, আবহাওয়া, অক্ষাংশ, দ্রাঘিমাংশ, বিষুবরেখা প্রভৃতি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত অথবা প্রভাবিত হয়। এ ক্ষেত্রে প্রাচীন সভ্যতার লীলাভূমি মেসোপটেমীয় অঞ্চলসহ অনেক ভৌগোলিক অঞ্চলের উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। ইরাক রাষ্ট্রের অন্তর্গত টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর মধ্যবর্তী ভূ-ভাগ ভৌগোলিকভাবে খুবই উর্বর ও উক্ত নদীদ্বয় যোগাযোগের ক্ষেত্রে সহায়ক ছিল বিধায় সেখানে সুমেরীয়, ব্যাবিলনীয়, এ্যাসেরীয়, ক্যালডীয় প্রভৃতি সভ্যতা গড়ে ওঠে। সুতরাং দেখা যায়, প্রথমে ভৌগোলিক অবস্থানের প্রেক্ষিত গড়ে ওঠে তারপর সেখানে মানুষের বসতি স্থাপনের মাধ্যমে সভ্যতা গড়ে ওঠে যা থেকে রচিত হয় ইতিহাস। ভৌগোলিকভাবে যদি উক্ত অঞ্চল অনুরূপ উর্বর ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য পরিবহণিক সুবিধেযুক্ত না হত তাহলে ঐ স্থানে কোন বসতি গড়ে ওঠত না এবং ঐ অঞ্চলে কোন সভ্যতা গড়ে ওঠার মধ্যদিয়ে কোন ইতিহাসও রচিত হত না ।

ইতিহাসের জনক হিরোডোটাস ভূগোল ও ইতিহাসের সম্পৃক্ততার কথা অতি গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেছেন। তিনি এশিয়া মাইনর ও মিসরসহ অনেক দেশে ব্যাপক ভ্রমণ করে প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতাকে যথাযথভাবে অনুধাবন করেন। তিনি উপলব্ধি করতে সক্ষম হন যে, মিসরের নীল নদের প্লাবনে দু’তীর প্লাবিত হত। যে কারণে পলিমাটি পড়ে নীল নদের তীরাঞ্চল উর্বর হয়ে ওঠত এবং এ উর্বর অঞ্চলে প্রথমে কৃষিভিত্তিক জনসমাজের বসতি গড়ে ওঠে। এভাবে ক্রমশ গড়ে ওঠে প্রাচীন বিশ্বখ্যাত মিসরীয় সভ্যতা। মিসরীয় সভ্যতা উন্মেষের পেছনে এভাবে নীল নদ তথা ভৌগোলিক অবস্থানের সরাসরি প্রভাব লক্ষ করা যায়। আর এজন্য হিরোডোটাস মিসরকে নীল নদের দান বলে অভিহিত করেছেন।

প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে মানুষ প্রকৃতি ও পরিবেশের সাথে সংগ্রাম করে নানা প্রতিকূলতা ও বন্ধুর পথ অতিক্রম করে বর্তমান সভ্যতায় উপনীত হয়েছে। এ প্রকৃতি ও পরিবেশই হল ভূগোল তথা ভৌগোলিক অবস্থা। সুতরাং যথাযথভাবে বলা যায়, ভৌগোলিক পরিবেশ ও ভূ-প্রকৃতির ওপর এবং ভূ- প্রকৃতির সাথে মানুষের বিরামহীন সংগ্রামের ইতিহাসই এক অর্থে মানব সভ্যতার ইতিহাস। ভূগোলের সাথে ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক প্রসঙ্গে বলা হয়, Geography and chronology are the sun and the moon, the right eye and the left eye of all history. (অর্থাৎ ভূ-প্রকৃতি ও সময়ানুক্রমকে ইতিহাস জগতের সূর্য, চন্দ্র, ডান ও বাম চোখ বলে গণ্য করা হয়)। যে কারণে একেক দেশ ও জাতির ইতিহাস একেক রকম। বিভিন্ন জাতির ইতিহাস বিভিন্ন রকম হওয়ার পেছনে যে সকল কারণ রয়েছে ভৌগোলিক প্রভাব তাদের মধ্যে অন্যতম। যে কারণে ভূ-প্রকৃতি ও পরিবেশকে ইতিহাসের মূল নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি বলে গণ্য করা হয়।

ওপরে বর্ণিত সভ্যতাগুলো ছাড়াও প্রাচীন সভ্যতাগুলো সাধারণত নদী তীরবর্তী অঞ্চলে গড়ে ওঠেছিল। নদী তীরে সভ্যতা গড়ে ওঠার পেছনে অবশ্যই ভৌগোলিক প্রভাব লক্ষণীয়। নদীর তীর অপেক্ষাকৃত উর্বর, পানীয় জলের সুবিধে, সেচ ব্যবস্থার সুবিধে ও পরিবহনের সুবিধে প্রভৃতি কারণে নদীর তীরে সভ্যতাসমূহ গড়ে ওঠেছিল। এক্ষেত্রে বিখ্যাত নীল নদের তীরবর্তী মিসরীয় সভ্যতা ও টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিস নদী তীরের মেসোপটেমীয় সভ্যতা ব্যতিরেকেও হোয়াংহো নদীর তীরে চৈনিক সভ্যতা, সিন্ধু নদের তীরে সিন্ধু সভ্যতা, টাইবার নদের তীরে রোমান সভ্যতা, কোরিন্থ উপসাগরের তীরে গ্রিক সভ্যতার কথা উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়। উল্লেখ্য, নদী তীরবর্তী ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই এ সকল স্থানে সভ্যতা গড়ে ওঠে এবং ইতিহাস এ সকল সভ্যতাকে ধারণ করে সঞ্জীবিত হয়। অতএব, সভ্যতা গড়ে তুলে ইতিহাসের গতি-প্রকৃতিকে নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে ভৌগোলিক প্রভাব অনস্বীকার্য।

আরও পড়ুন:

ইতিহাসের সাথে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সম্পর্ক আলোচনা

ইতিহাসের সাথে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সম্পর্ক আলোচনা

কোন একটি জাতির ইতিহাস রচনা করার ক্ষেত্রে ভূগোলের প্রভাব সম্পর্কে অবগত হওয়ার জন্য প্রাচীন গ্রিস ও ইংল্যান্ডের পর্যালোচনা করা যায়। গ্রিস রাষ্ট্রটি ছোট ছোট বহু সংখ্যক পাহাড় দ্বারা বহু খণ্ডে বিভক্ত থাকার কারণে সেখানে সংঘবদ্ধ রাষ্ট্রের স্থলে প্রাচীনকালে অনেকগুলো নগররাষ্ট্র (এথেন্স, স্পার্টা, মেগারা, থিবস, কোরিন্থ, মিলেটাস প্রভৃতি) গড়ে ওঠেছিল তবে ভৌগোলিকভাবে এ সকল নগররাষ্ট্র অপেক্ষাকৃত ছোট হওয়াতে প্রাচীনকালেই গ্রিসের অধিবাসীরা রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে বেশ সচেতন হয়ে ওঠেছিল। আবার চারদিকে সাগর দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকার কারণে ইংল্যান্ডের জনগণ নৌবিদ্যায় পারদর্শী হয়ে ওঠে। সমুদ্র সন্নিকটস্থ ইংল্যান্ডবাসী সামুদ্রিক বাণিজ্য ও উপনিবেশ স্থাপনে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করে। এভাবে ভৌগোলিক অবস্থান ও পরিবেশ গ্রিস ও ইংল্যান্ডের ইতিহাসের গতিকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে।

ভারতর্ষের ইতিহাসকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে খাইবার ও বোলান নামক ভৌগোলিক অবস্থানের গিরিপথদ্বয় অভাবনীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কারণ এ গিরিপথ দিয়ে পারসিক, গ্রিক, শক, কুষাণ, হুন ও মুঘলরা এদেশে আগমন করে ভারতের ইতিহাসকে নানা জাতির ইতিহাসে পরিণত করেছে। অতএব বলা যায়, কোন জাতির ইতিহাস রচনা করা বা যথাযথভাবে উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে ঐ জাতির ভৌগোলিক অবস্থানগত প্রেক্ষাপট সম্যকভাবে বিশ্লেষণের প্রয়োজন রয়েছে। ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত হতে গিরিপথ দিয়ে আগত বিদেশী আক্রমণকারীদেরকে দিল্লি ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চল অতিক্রম করেই আর্যাবর্তে প্রবেশ করতে হত। যে কারণে দিল্লি ও এর পার্শ্ববর্তী ভৌগোলিক অঞ্চলের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায় এবং এখানেই ভারতীয়রা বহিঃরাক্রমণকারীদের প্রতিহত করার চেষ্টা করে। সেজন্য তরাইনের দুটি ও পানিপথের তিনটি যুদ্ধ দিল্লির নিকটবর্তী অঞ্চলেই সংঘটিত হয়। এখানেও দেখা যায় ভৌগোলিক অঞ্চল ‘তরাইন’ ও ‘পানিপথ’ ভারতের ইতিহাসের গতিতে নতুনমাত্রা সংযোজিত করেছে। আবার অন্যভাবে বলা যায়, তরাইনের প্রথম যুদ্ধে ঘুরীর ব্যর্থতার ইতিহাস তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধের জন্য ঐ স্থানকেই ভৌগোলিকভাবে নির্ধারণ করে নব ইতিহাস সৃষ্টি করে। তরাইন ও পানিপথের অস্তিত্ব ভৌগোলিকভাবে অনেক পূর্ব থেকেই বিদ্যমান ছিল। কিন্তু ঐ স্থানদ্বয় তেমনভাবে সুপরিচিত ছিল না এবং ইতিহাসের পাতায় ঐ স্থানদ্বয়ের নাম লেখাও ছিল না। ১১৯১ ও ১১৯২ খ্রিস্টাব্দে তরাইন প্রান্তরে পৃথ্বিরাজ ও মুহম্মদ ঘুরীর মধ্যে পরপর দুটি এবং পানিপথ প্রান্তরে ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে ইব্রাহিম লোদী ও বাবরের মধ্যে (পানিপথের প্রথম যুদ্ধ), ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দে আদিল শাহের সেনাপতি হিমু ও আকবরের সেনাপতি বৈরাম খানের মধ্যে দ্বিতীয় যুদ্ধ (পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ) এবং ১৭৬১ খ্রিস্টাব্দে মারাঠা শক্তি ও আহম্মদ শাহ আবদালীর মধ্যে পানিপথ প্রান্তরে তৃতীয় যুদ্ধ (পানিপথের তৃতীয় যুদ্ধ) সংঘটিত হওয়ার পর ভৌগোলিক অবস্থান হিসেবে পানিপথের অবস্থানগত কোন পরিবর্তন হয়নি। কিন্তু পরপর তিনটি যুদ্ধের কারণে পানিপথ নামক স্থানের গুরুত্ব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায় এবং ইতিহাসে তা লিপিবদ্ধ হয়। এভাবে ইতিহাস ও ঐতিহাসিক ঘটনা ভৌগোলিক অবস্থানের গুরুত্ব বৃদ্ধি করে এবং বিশ্ব সমাজের কাছে তুলে ধরে।

পৃথিবীর স্থল ও জলভাগসহ সকল অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থানগত গুরুত্ব সাধারণত সমান। তাই যখনই কোন স্থানে কোন ঐতিহাসিক অনুষ্ঠান, সম্মেলন, চুক্তি সম্পাদিত হয় কিংবা কোন স্থাপত্য নির্মিত হয় ও যুদ্ধ সংঘটিত হয় তখনই ঐ স্থানের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায়। যেমন- ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের পূর্বে ভাগীরথীর পার্শ্বস্থিত অঞ্চলের নাম পলাশীই ছিল। কিন্তু ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের পূবে ঐ পলাশী নামক ভৌগোলিক অবস্থানের পরিচিতি কতটুকুই বা ছিল? কিন্তু ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে ঐ স্থানে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও নবাব সিরাজউদ্দৌলার মধ্যে প্রহসনমূলক যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার পর ঐ স্থান ব্যাপকভাবে পরিচিতি লাভ করে। পলাশী নামক ভৌগোলিক অবস্থানের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাবার একমাত্র কারণ ঐ স্থানে ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছে। অতএব দেখা যায়, “ঐতিহাসিক ঘটনার মাধ্যমে ভৌগোলিক অবস্থানের গুরুত্ব ও পরিচিতি বৃদ্ধি পায়। এভাবে ঐতিহাসিক ঘটনা ছাড়া ভৌগোলিক অবস্থান থেকে যায় নাম পরিচয় বিহীন এক বিরাণ ভূমিরূপে। ইতিহাস ভূগোলকে বিশ্ব পরিমণ্ডলে তুলে ধরে। আবার ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত হওয়ার জন্য অবশ্যই জল, স্কুল বা নভোমণ্ডলের কোন না কোন ভৌগোলিক অবস্থান অবশ্যই দরকার। সুতরাং ইতিহাস কখনো ভৌগোলিক অবস্থান ছাড়া অগ্রসর হতে পারে না এবং ভূগোলও ইতিহাস ছাড়া পরিচিতি লাভ করতে পারে না ।

ইতিহাসের শাখাসমূহের মধ্যে ভৌগোলিক ইতিহাস যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ভূগোলের শাখাসমূহের মধ্যে ঐতিহাসিক ভূগোলও গুরুত্বপূর্ণ । ভৌগোলিক ইতিহাস যেমন ভূ-প্রকৃতি ও ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কে ঐতিহাসিক জ্ঞানের পরিধিকে পরিব্যাপ্ত করে, তেমনি ঐতিহাসিক ভূগোল ইতিহাসের তথ্যসমৃদ্ধ ভূগোল সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞানদানে সচেষ্ট থাকে। সুতরাং সহজভাবে বলা যায়, ভৌগোলিক জ্ঞানসমৃদ্ধ ইতিহাস জানার জন্য ভৌগোলিক ইতিহাস পাঠের প্রয়োজনীয়তার পাশাপাশি ভূগোলকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষিতে জানার জন্য ঐতিহাসিক ভূগোলেরও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। তাছাড়া কোন ঘটনার ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট জানার যেমন গুরুত্ব রয়েছে, অনুরূপভাবে কোন ঘটনার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট জানারও তাৎপর্য রয়েছে। অতএব, ইতিহাস ও ভূগোল একে অপরের সাথে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত।

আধুনিককালে ইতিহাস ও ভূগোলের শাখা-প্রশাখা অনেক বিস্তার লাভ করেছে। ইতিহাসের যেমন রয়েছে রাজনৈতিক শাখা, প্রাকৃতিক শাখা, সামাজিক শাখা, অর্থনৈতিক শাখা, সাংস্কৃতিক শাখা, ধর্মীয় শাখা ইত্যাদি। অনেকটা তেমনিভাবে ভূগোলেরও রয়েছে প্রাকৃতিক ভূগোল, রাজনৈতিক ভূগোল, অর্থনৈতিক ভূগোল, সামাজিক ভূগোল ইত্যাদি শাখা। রাজনৈতিক ইতিহাস রাজনৈতিক প্রশাসকদের অতীত কর্মের চিত্র তুলে ধরে এবং রাজনৈতিক ভূগোল একজন রাজনৈতিক প্রশাসকের রাষ্ট্রের পরিসীমা, প্রশাসনিকভাবে বিভক্ত রাষ্ট্রের প্রদেশ বা বিভাগ, জেলা, থানা, ইউনিয়ন (সিটি কর্পোরেশন, ওয়ার্ড) এর চিত্র সম্পর্কে জ্ঞান দান করে। অনুরূপভাবে প্রাকৃতিক ইতিহাস ও প্রাকৃতিক ভূগোলের মধ্যে এবং অর্থনৈতিক ইতিহাস ও অর্থনৈতিক ভূগোলের মধ্যেও নানাভাবে সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। কারণ প্রাকৃতিক ইতিহাস অতীতের প্রাকৃতিক চিত্রকে চিত্রণ করে গড়ে ওঠে। যা পাঠ করলে অতীতের প্রাকৃতিক পরিবেশের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা যায়। আবার প্রাকৃতিক ভূগোল পাহাড়পর্বত, আগ্নেয়গিরি, ভূ-প্রকৃতির গঠন, জলবায়ু, আবহাওয়া, নদনদী, জোয়ার-ভাঁটা, অরণ্যময় অঞ্চল, মালভূমিসহ প্রকৃতির নানাদিক তুলে ধরে।

ইতিহাস ও ভূগোল অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত বিধায় ইতিহাসের শিক্ষককে ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রের সাহায্যে ইতিহাসের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দিতে হয়। কার্যত ভূ-মানচিত্র ছাড়া যথাযথভাবে ইতিহাস পঠন-পাঠন সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। একইভাবে একজন ভূগোলের শিক্ষককেও যথাযথভাবে ভূগোল পাঠ করা বা পাঠদানের সময় ঐ ভূগোল সংক্রান্ত বিষয়টির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকা আবশ্যক। কারণ ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ছাড়া কোন ভৌগোলিক জ্ঞান পরিপূর্ণ হতে পারে না। তাছাড়া একজন ভূগোলবিদকে যথাযথভাবে ভূগোল রচনা করার জন্য ইতিহাস থেকে তথ্য সংগ্রহ করতে হয়। কারণ ঐতিহাসিক তথ্য ছাড়া পূর্ণাঙ্গ ভূগোল রচনা করা সম্ভবপর নয়।

কোন সভ্যতার উদ্ভবের পটভূমি, কোন স্থাপত্য বা অনুরূপ কিছু নির্মাণের প্রেক্ষিত, যুদ্ধে জয়-পরাজয়ের কারণ নিরূপণ করা প্রভৃতি অনেক কিছু সম্যকভাবে জানতে হলে তদস্থলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে পরিপূর্ণ জ্ঞান থাকা একান্ত আবশ্যক। ফ্রান্সের আধুনিক ঐতিহাসিক মাইকিলেট (Maichelet)-এর মতে ইতিহাসকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে হলে * সমকালীন ভৌগোলিক জ্ঞান থাকা বাঞ্ছনীয়। তাঁর মতে, যথাযথ ভৌগোলিক ভিত ছাড়া কার্যত ইতিহাস কখনো বস্তুনিষ্ঠ হতে পারে না। ইতিহাসকে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে হলে তা অবশ্যই ধারাবাহিক, সময়ানুক্রমিক ও ভৌগোলিক ভিত সংশ্লিষ্ট হতে হবে। যেমন— ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট আকবর ও দাউদ খান কররাণীর মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং এ যুদ্ধে দাউদ খান পরাজিত ও নিহত হন। এখানে ভৌগোলিক ভিত সংস্থাপন করা হয়নি অর্থাৎ যুদ্ধটি কোন ভৌগোলিক অঞ্চলে হয়েছে তার উল্লেখ নেই। অতএব, এখানে সময় উল্লেখ থাকলেও শুধু ভৌগোলিক অবস্থানের উল্লেখ না থাকাতে বর্ণনাটি গ্রহণযোগ্য ও বস্তুনিষ্ঠ হয়নি। যুদ্ধটি যে ‘রাজমহল’ নামক স্থানে সংঘটিত হয়েছে তা অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে। সুতরাং ভূগোল ছাড়া ইতিহাস যেন অন্তঃসারশূন্য ও অগ্রহণযোগ্য বিষয়ে পরিণত হয়ে যায়। আবার অনেকটা একইভাবে যদি শুধু রাজমহল শব্দটি ব্যবহার করা হয় তাহলেও এ ভৌগোলিক অবস্থান দ্বারা কোন কিছু স্পষ্টভাবে বুঝার উপায় নেই। অতএব, রাজমহলে কখন, কাদের মধ্যে কী ঘটনা ঘটেছিল তা উল্লেখ করতে হবে। আর কাদের মধ্যে কী ঘটেছিল সেটাই হল ইতিহাস বা ঐতিহাসিক কর্ম। অতএব বলা যায়, মানুষের অতীত কর্মকাণ্ড তথা ইতিহাস ছাড়া ভূগোল এবং ভূগোল ছাড়া ইতিহাস পরিপূর্ণ হতে পারে না।

বাংলার ইতিহাসের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ভূ-প্রকৃতির অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। প্রাচীন ভারতীয় ভূখণ্ডের মধ্যে বাংলা অপেক্ষাকৃত অধিক নিম্নাঞ্চল ও নদনদীতে ভরপুর ছিল। যে কারণে অত্রাঞ্চলের ইতিহাস অনেকটা স্বকীয় বৈশিষ্ট্য নিয়ে গড়ে ওঠে। মৌর্য (খ্রিঃ পূঃ চতুর্থ ও তৃতীয় শতক) ও গুপ্ত আমলে (খ্রিস্টীয় তৃতীয় ও চতুর্থ শতক) বাংলা তাদের একটি ‘ভূক্তিতে’ (প্রদেশ) পরিণত হয়। এটি পুণ্ড্রবর্ধন ‘ভূক্তি’ নামে পরিচিত ছিল এবং এর রাজধানী তথা মূল প্রশাসনিক কেন্দ্র ছিল বর্তমান বগুড়া জেলার মহাস্থানগড়। অবশ্য এ রাজধানীর নাম ছিল পুণ্ড্রনগর। মৌর্য ও গুপ্ত আমলে বাংলা কিছুদিন তাদের শাসনাধীন ছিল। এরপর শশাঙ্ক, পাল ও সেন আমলে বাংলার ওপর উত্তর ভারতের শাসকগণ কর্তৃত্ব আরোপ করতে পারেনি। উল্লেখ্য, উত্তর ভারত হতে ভৌগোলিকভাবে বাংলা অনেক দূরে অবস্থিত ছিল বিধায় অত্রাঞ্চলে একটি স্বাধীন রাজনৈতিক স্বত্ত্বা গড়ে ওঠে। তাছাড়া মুসলিম আমলেও সুদূর দিল্লি হতে বাংলা অঞ্চলে নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। যে কারণে গিয়াসউদ্দিন ইওয়াজ খলজী, মুগীসউদ্দিন তুগ্রিলসহ অনেকেই দিল্লির অধীনতা হতে মুক্ত হয়ে বাংলা শাসনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। এরপর দিল্লির সুলতান মুহম্মদ-বিন- তুঘলকের সময় ১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলা সম্পূর্ণ স্বাধীন হয়ে যায়। যে স্বাধীনতা ১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। দিল্লি হতে বাংলা ভৌগোলিকভাবে অনেক দূরে অবস্থিত ছিল বিধায় বাংলা দিল্লির তথা উত্তর ভারতের কর্তৃত্বমুক্ত থাকতে সক্ষম হয়। এখানকার শাসকগণ নৌবাহিনী গড়ে তুলতেও সচেষ্ট ছিলেন। প্রাচীন যুগের মহাকবি কালিদাস ও মধ্যযুগের ঐতিহাসিক আবুল ফজলের বিবরণ হতে জানা যায় যে, বাংলার শাসকগণ নৌযুদ্ধে পারদর্শী ছিলেন। ঐতিহাসিক আবুল ফজলের মতে নৌকার গলুই হতে দূর্গ আক্রমণ করার জন্য গলুই অনেক উঁচু করে তৈরি করা হত। বিশেষ করে বাংলার সুলতান গিয়াসউদ্দিন ইওয়াজ খলজী পূর্ববঙ্গের ওপর স্বীয় আধিপত্য অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য নৌবাহিনীর ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। অতএব দেখা যায়, বাংলার ভূ-প্রকৃতি বাংলার ইতিহাসকে দিল্লি হতে বিচ্ছিন্ন করে নৌবাহিনী সমৃদ্ধ ইতিহাস সৃষ্টিতে প্রভাবিত করেছে। আবার অন্যভাবে বলা যায়, শশাঙ্ক, পাল, সেন ও সুলতানী আমলে স্বাধীনতার বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত বাংলার ইতিহাস এ অঞ্চলের ভৌগোলিক মর্যাদা ও গুরুত্বকে সুন্দরভাবে তুলে ধরেছে। অর্থাৎ বাংলার ইতিহাসকে ভূগোল এবং বাংলার ভৌগোলিক অঞ্চলকে ইতিহাস স্বকীয় বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেছে। ভূগোল ও ইতিহাসের মধ্যে অনেক সাদৃশ্য থাকা স্বত্ত্বেও উভয়ের মধ্যে বৈসাদৃশ্যও কম নয়। ইতিহাস নামক বিষয়টি আদিম গুহাবাসী মানব হতে শুরু করে মানব সভ্যতার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরতে প্রয়াসী। কিন্তু ভূগোল শুধু সীমিত পরিসরে মানুষের জ্ঞাত ভূ-প্রকৃতি, জলবায়ু প্রভৃতি নিয়ে আলোচনা করে থাকে। উৎপত্তিগতভাবে ইতিহাসের অনেক পরে ভূগোলের পঠন-পাঠন শুরু হয়। ইতিহাসের আলোচ্যসূচি তথা বিষয়বস্তু হল মানুষ, তার সমাজ ও সভ্যতার সকল কিছু। পক্ষান্তরে ভূগোলের আলোচ্যসূচি ইতিহাসের বিস্তর আলোচ্যসূচি অপেক্ষা অনেক সংকীর্ণ। জল, স্থল ও নভোমণ্ডলে মানুষ যা কিছু করেছে ও বলেছে তার সবই হল ইতিহাসের আলোচ্যসূচি। সত্যিকার অর্থে ভৌগোলিক কর্ম সম্পাদন করতে গিয়ে মানুষ যা কিছু করেছে তা বৃহত্তর অর্থে ইতিহাসের পর্যায়ভুক্ত বিষয়। কারণ মানুষের সকল প্রকার অতীত কর্মের বিবরণ হল ইতিহাস।

ইতিহাস অতীতকে বর্তমানের মধ্যে বাঁচিয়ে রাখে এবং বর্তমান প্রজন্মকে সঠিকপথের প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করে। পক্ষান্তরে ইতিহাসের পাতায় ভর করে ভূগোল অতীতের ভৌগোলিক চিত্র তুলে ধরে মাত্র। ইতিহাসে ভূগোলের চেয়ে অনেক বেশি মানবিকতা পরিদৃষ্ট হয়। স্বদেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদী ইতিহাস শোষিত ও বঞ্চিত জনসমাজকে অধিকার আদায়ে অনুপ্রাণিত করে স্বাধীনতার পথে ধাবিত হতে অঙ্গুলি নির্দেশ করে। কিন্তু ভূগোলের মাধ্যমে অনুরূপ কোন দিকনির্দেশক ও চেতনামূলক কিছু করা : সম্ভবপর নয়। ইতিহাসের মাধ্যমে ভূগোল বিশ্ব দরবারে পরিচিতি লাভ করে। কারণ ঐতিহাসিক কোন ঘটনা না ঘটলে কোন ভৌগোলিক অঞ্চলের পরিচিতি ও গুরুত্ব কোনরূপ বৃদ্ধি পায় না।

Related Posts