Home শিক্ষাইতিহাস ইতিহাসের সাথে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সম্পর্ক আলোচনা

ইতিহাসের সাথে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সম্পর্ক আলোচনা

by Rezaul Karim
ইতিহাসের সাথে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সম্পর্ক

ইতিহাসের সাথে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সম্পর্ক কেমন, এ দুটি বিষয় পরস্পরের সাথে কতটা নির্ভরশীল ও সম্পর্কযুক্ত এসব বিষয় নিয়েই আজকের আলোচনা।

ইতিহাসের সাথে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সম্পর্ক

সাধারণভাবে বলা হয় মানুষ ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, বিভিন্ন মানবগোষ্ঠীর মধ্যে আদান-প্রদান, সংঘর্ষ ও সমন্বয়ের ফলে বৃহত্তর মানব সমাজের ক্রমোন্নতির ধারাবাহিক বিবরণ হল ইতিহাস। আর রাষ্ট্র নামক বৃহৎ প্রতিষ্ঠানের উদ্ভব, উদ্দেশ্য, মৌল উপাদান এবং রাষ্ট্রের কার্যকারিতা সম্পর্কিত নিয়মানুগ ও সুসংবদ্ধ অধ্যয়ন হল রাষ্ট্রবিজ্ঞান। ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের উপর্যুক্ত সংজ্ঞা দুটিকে সম্যকভাবে বিশ্লেষণ না করেও অতি সহজেই বুঝা যায় যে, ইতিহাস মানুষ ও মানুষের মধ্যকার সম্পর্ক এবং সমাজ সম্পর্কিত কর্মের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে। আর রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে রাষ্ট্র ।

আরো সংক্ষেপে বলা যায়, ইতিহাস মূলত মানুষ ও তার অতীত কর্মকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞান মূলত রাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। এখানে আরো একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, ‘রাষ্ট্রবিজ্ঞান’কে বিজ্ঞান অর্থাৎ বিশেষজ্ঞানের অধিভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু ইতিহাস কী তাহলে বিশেষজ্ঞানের আওতার বাইরের বিষয়? আপাতদৃষ্টিতে ইতিহাসকে বিশেষজ্ঞানের আওতা বহির্ভূত বিষয় মনে হলেও বাস্তবিক পক্ষে ও যথাযথ বিচার-বিশ্লেষণে তা সঠিক নয়।

ইতিহাস অবশ্যই বিশেষজ্ঞানের দ্বারা সমৃদ্ধ মানুষের অতীত কর্মের খতিয়ান সম্পর্কিত অত্যুৎকৃষ্ট বিজ্ঞান। যদি প্রশ্ন করা হয় অতীতের মানুষ, তার সমাজ, সভ্যতা প্রভৃতি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে রচিত বিষয়গুলোর মধ্যে কোনটি সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য। তাহলে স্বভাবতঃই উত্তর হবে ইতিহাস। বিশ্ব সভ্যতার হাজার বছরের অতীত খতিয়ান গবেষণা ছাড়াই কি ইতিহাসের পাতায় স্থান লাভ করেছে? মোটেও তা নয়। একজন ঐতিহাসিককে অবশ্যই প্রাপ্ত তথ্যকে যাচাই-বাছাই ও বিচার-বিশ্লেষণ করে তা ইতিহাসের পাতায় সন্নিবেশিত করতে হয়। একজন ঐতিহাসিকের পরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণের জন্য পরীক্ষাগার (Laboratory) না থাকলেও অবশ্যই তার গবেষণাগার (Research centre) আছে। আর এখানে তিনি একান্ত নিবিষ্ট মনে গবেষণা করে প্রামাণ্য ও দালিলিক ইতিহাস রচনা করে থাকেন। একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরও পরীক্ষণ ও পর্যবেক্ষণের জন্য পরীক্ষাগার থাকে না, তবে তার থাকে ঐতিহাসিকের মত গবেষণাগার (Research centre)।

তাহলে দেখা যায়, একজন ঐতিহাসিক ও একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দু’জনেই গবেষণাগারে গবেষণা করে ইন্সিত লক্ষে পৌঁছতে চেষ্টা করেন। অথচ একজন লিখছেন মানবিকবিদ্যা সম্পর্কিত ইতিহাস এবং অন্যজন বিজ্ঞানী উপাধি নিয়ে বিশেষজ্ঞানের আওতাভুক্ত হয়ে বিজ্ঞান (রাষ্ট্রবিজ্ঞান) রচনা করেছেন। একজন ঐতিহাসিক যখন হাজার হাজার বছর পূর্বের পুরোপলীয় যুগ ও নবোপলীয় যুগের জীবাশ্ম এবং মানুষের ব্যবহার্য দ্রব্যাদির ওপর গবেষণা করে ইতিহাস রচনা করেন, তখন তার গবেষণার একান্ত নিবিষ্টতা, ধ্যানমগ্নতা, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণ ও গভীরতার পরিমাণ কোন কোন বৈজ্ঞানিক কর্মের চেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে একজন ঐতিহাসিক কি বিশেষভাবে গবেষণা কর্মের জন্য প্রকারান্তরে একজন বৈজ্ঞানিকের পর্যায়ভুক্ত নন এবং তার ঐ কর্মটি কি বিশেষজ্ঞানের অর্থাৎ বিজ্ঞানের পর্যায়ভুক্ত হয়ে পড়ে না? কাজেই এভাবে ইতিহাস কি ‘ইতিহাস বিজ্ঞান’ হিসেবে পরিচিত হতে পারে না? প্রকৃত বিচারে ইতিহাসকে মানুষের অতীত কর্মের যথাযথ জ্ঞানভাণ্ডার এবং বিশেষভাবে গবেষণালব্ধ প্রামাণ্য দলিল বলে গণ্য করা যায়।

উৎপত্তিগত দিক থেকে ইতিহাস অবশ্যই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের চেয়ে অনেক প্রাচীন। পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাবের সাথে সাথে ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত ও ঐতিহাসিক কর্মের সূচনা হয়। কারণ মানুষ সৃষ্টি, পৃথিবীতে মানুষের আগমন, বসতি স্থাপন, মানুষের বন্যদশা, বর্বরদশা ও ক্রমান্বয়ে সভ্যতা গড়ে তোলা এ সবই ইতিহাস। পক্ষান্তরে রাষ্ট্রনামক প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে যেহেতু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের উৎপত্তি হয়েছে কাজেই বলা যায়, রাষ্ট্রের উৎপত্তির পরই মূলত রাষ্ট্রবিজ্ঞানের যাত্রা শুরু ।

উল্লেখ্য, ইতিহাসের জনক হিরোডোটাস ৪৮৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এশিয়া মাইনরের হেলিকার্নেসাস শহরে জন্মগ্রহণ করেন। পরে গ্রিসে চলে যান বিধায় তাকে গ্রিসের অধিবাসী বলে অভিহিত করা হয়। তিনিই সর্বপ্রথম মানুষের অতীত কর্মের খতিয়ানকে History বলে অভিহিত করেন। পক্ষান্তরে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের আদি গুরু গ্রিসের অধিবাসী এরিস্টটলের জন্ম ৩৮৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রাণপুরুষদ্বয়ের জন্মকালের ভিত্তিতে বিচার করলেও দেখা যায় ইতিহাসের শুভ সূচনা হয়েছে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পূর্বে ।

বিষয়বস্তু ও পরিধিগত দিক থেকে বলা যায়, রাষ্ট্রের উৎপত্তি, রাষ্ট্রের কাঠামো, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানাদি, সংবিধান, আন্তর্জাতিক সংস্থা ও আইন, বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থার তুলনামূলক পর্যালোচনা, নীতি নির্ধারণ করা প্রভৃতি বিষয়কে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রবিজ্ঞান গড়ে ওঠে। অন্যদিকে মানুষ, তার সমাজ, সভ্যতা, জীবনধারা, সকল মানুষের সকল প্রকার কর্মের বিস্তারিত বিবরণসহ রাষ্ট্রের প্রায় সবদিক ও প্রামাণ্য তথ্যের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে ইতিহাস। অন্যভাবে বলা যায়, স্থল, জল ও নভোমণ্ডলে মানুষের যাবতীয় কর্মকে চিত্রায়ন করে গড়ে ওঠে ইতিহাস। অতএব দেখা যায়, সকল প্রকার রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের যাবতীয় বিষয় রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইতিহাস উভয়েরই সাধারণ (common) বিষয়। কিন্তু রাষ্ট্র সংক্রান্ত বিষয় ব্যতীত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের কোথায় মানুষ কী করছে এবং কী করবে তার সকল কিছুই ইতিহাসের বিষয়বস্তু। সুতরাং বলা যায়, বেশি বিস্তৃত । ইতিহাসের পরিধি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিধির চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত।

রাষ্ট্রের উৎপত্তি ও ক্রমবিবর্তনের যাবতীয় তথ্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে প্রকৃত অর্থে ইতিহাস থেকে গ্রহণ করতে হয়। একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অতীতের ঘটনা অর্থাৎ ইতিহাস থেকে প্রয়োজনীয় উপাদান সংগ্রহ করে রাষ্ট্রবিজ্ঞান রচনায় সচেষ্ট হন। রাষ্ট্রবিজ্ঞান মূলত ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতে স্বীয় কলেবরকে স্ফীত করে থাকে। যেজন্য এক অর্থে ইতিহাসকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের গবেষণাগার বলে অভিহিত করা হয়। অতীতে কোন্ কোন্ ঘটনা কোন্ প্রেক্ষাপটে ঘটেছে, এ সকল ঘটনাগুলোর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব কী প্রভৃতি ঐতিহাসিক বিষয় সম্পর্কে রাষ্ট্রবিজ্ঞান গবেষণা করে এবং অতীতের ভিত্তির ওপর বর্তমানকে দাঁড় করাতে চেষ্টা করে। অর্থাৎ রাষ্ট্রবিজ্ঞান ইতিহাস থেকে তিল তিল করে রাজনৈতিক চিন্তাধারা সংগ্রহ করে থাকে। Lord Acton এ প্রসঙ্গে বলেন, “The science of politics is the one science that is deposited by the stream of history like the grains of gold in the sands of a river” (অর্থাৎ ইতিহাসের স্রোতধারায় বালুকণাসমূহের মধ্যে স্বর্ণরেণুর মত রাষ্ট্রবিজ্ঞান জমে ওঠেছে)। প্রকৃতপক্ষে ইতিহাস থেকে তথ্য সংগ্রহ না করে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পক্ষে অগ্রসর হওয়া সম্ভব নয়। সত্যিকারঅর্থে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সূত্র ঐতিহাসিক তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠেছে। যে জন্য W.W. Willoughby বলেন, “History provides the third dimension to political science” (অর্থাৎ ইতিহাসই রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে গভীরতা দান করেছে)।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিপূর্ণতা ও সার্থকতার পশ্চাদভূমিতে যেমন ইতিহাসের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঠিক একইভাবে ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গতা ও কার্যকারিতার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রবিজ্ঞানেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যেজন্য বলা হয়, History is past politics অর্থাৎ অতীতের রাজনীতিই হল ইতিহাস। বস্তুত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, রাষ্ট্রীয় কর্ম, সংবিধান প্রভৃতি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিশেষ আলোচ্য বিষয়। কিন্তু এ বিষয়গুলো ব্যতীত ইতিহাস প্রাণহীন দেহের মত। রাষ্ট্রের আইন ও অন্যান্য নীতি সম্পর্কে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ইতিহাসকে অনেক ইতিহাসের সাথে অন্যান্য বিষয়ের সম্পর্ক মালমসলার যোগান দেয়। ইতিহাস অনেক সময় রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দেয়া তথ্যাবলি হতে ঘটনা পরম্পরায় রাজনৈতিক ইতিহাসের রূপ পরিগ্রহ করে থাকে। প্রকৃতপক্ষে ইতিহাসের রাজনৈতিক শাখা একান্তভাবেই রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাথে সম্পর্কিত। ইতিহাস যদি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাথে সম্পর্কহীন হয়ে পড়ে তাহলে তা’ অনেক ক্ষেত্রে সাহিত্যের পর্যায়ভুক্ত হয়ে পড়ে। এজন্য ইতিহাসকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাথে নিবিড় সম্পর্ক রাখতে হয়। বিশেষ করে রাজনৈতিক ইতিহাসের ক্ষেত্রে এ অভিধাটি অনেকাংশে সত্য। জাতীয় রাষ্ট্রের উদ্ভব, আধুনিক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা, সাংবিধানিক অভিব্যক্তি, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ, জাতীয়তাবাদ, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কাঠামো, প্রশাসনিক রীতিনীতি প্রভৃতি বিষয় ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মধ্যে তাৎপর্যপূর্ণ যোগসূত্র স্থাপন করেছে। এ বিষয়ের সাথে ঐক্যমত পোষণ করে Burgess যথার্থভাবে বলেন, “When these two are cut off, history becomes a cripple, if not a corpse and political science is reduced to a will-o-the wisp” efte উভয়কে (রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইতিহাস) যদি পৃথক করে দেয়া হয় তাহলে ইতিহাস মৃত না হলেও হবে বিকলাঙ্গ এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞান হবে আলেয়ার মত অস্পষ্ট ও অবাস্তব ।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং ইতিহাসকে এক অর্থে একটি মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ বলে অভিহিত করা যায়। রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক কর্ম মূলত রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিষয় হলেও যিনি আজ এ মুহূর্তে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন তিনি অবশ্যই একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। অথচ আগামীকাল তার কার্যক্রম ইতিহাসের পাতায় স্থান লাভ করতে পারে। তাহলে দেখা যায়, আজকের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডই আগামীকাল ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বে ও ঐতিহাসিক কর্মে পরিণত হতে পারে। বিষয়টি আরো স্পষ্ট করে এভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে, আজকের বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ভারতের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট অথবা অনুরূপ ব্যক্তিত্বগণ সকলেই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং তাঁরা যা করছেন তা মূলত রাজনৈতিক কর্ম। তাঁদের আজকের কার্যক্রমগুলো আগামীকাল ঐতিহাসিক কর্মে পরিণত হবে। সুতরাং রাষ্ট্রবিজ্ঞান তথা রাজনীতি ও ইতিহাসের মধ্যে এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও কর্মের সাথে ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ও কর্মের পার্থক্য অতি সামান্য। অতএব বলা যায়, আজ যা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিষয় আগামীকাল তা হবে ইতিহাসের বিষয়।

ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মধ্যে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ও অনেক সামঞ্জস্যতা থাকলেও উভয়ের মধ্যে বৈসাদৃশ্যও একেবারে কম নয়। ইতিহাসের পরিধি ও বিষয়বস্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের পরিধি ও বিষয়বস্তু হতে অনেক বিস্তৃত। অন্যভাবে বলা যায়, রাষ্ট্রবিজ্ঞান মূলত ইতিহাসের রাজনৈতিক শাখাভুক্ত একটি বিষয়ের পর্যায়ে পড়ে। ইতিহাসের রাজনৈতিক শাখা ছাড়াও রয়েছে সামাজিক ইতিহাস, অর্থনৈতিক ইতিহাস, স্থাপত্যিক ইতিহাস, সাংস্কৃতিক ইতিহাস প্রভৃতি। ইতিহাস ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মধ্যকার পার্থক্য প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক Freeman বলেন, “ইতিহাস শুধু অতীত রাজনীতি নয় এবং অন্যদিকে রাজনীতি শুধু বর্তমান ইতিহাস নয়”। ঐতিহাসিক ভিত ছাড়াও রাষ্ট্রবিজ্ঞান শুধু নৈতিক, মনোবৈজ্ঞানিক ও রাষ্ট্রীয় দর্শনের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠতে পারে। যেমনথ ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত ছাড়া রচিত গ্রিক দার্শনিক ও রাজনীতিবিদ প্লেটোর ‘The Republic’ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অতি গুৰুত্বপূৰ্ণ দিক।

ইতিহাস সকল মানুষের সকল প্রকার তথ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। যে কারণে ইতিহাস সার্বিকভাবে মানুষের জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি করতে সহায়ক হয়। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞান রাষ্ট্র সম্পর্কিত বিষয় ছাড়া অন্য বিষয়ে নীরব। কাজেই রাষ্ট্রবিজ্ঞান মানুষের জ্ঞানের পরিধিকে সার্বিকভাবে বৃদ্ধি করতে সহায়তা করতে পারে না। তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞান মানুষের জ্ঞানের পরিধিকে ইতিহাস অপেক্ষা ক্ষুদ্র ও সুনির্দিষ্ট পরিসরে এগিয়ে যেতে সহায়তা করে থাকে। উল্লেখ্য, সঠিক ও যথাযথ ইতিহাস রচনা করার জন্য সমকালীন রাজনীতি সম্পর্কে জ্ঞান থাকা একান্ত অত্যাবশ্যক। রাজনৈতিকতত্ত্ব ও রাজনৈতিক ইতিহাসের সাথে অন্যান্য বিষয়ের সম্পর্ক সংগঠনের প্রকৃতি সম্পর্কে সম্যক ধারণা না থাকলে পরিপূর্ণ ইতিহাস রচনা করা সম্ভবপর নয়। আবার অতীতের ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক তথ্য ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ রাষ্ট্রবিজ্ঞান রচনা করা যায় না। উল্লেখ্য যে, প্রতিটি ব্যক্তি, জাতি, বস্তু, বিষয় এমনকি প্রতিটি প্রাণিরও ইতিহাস আছে। অতএব, রাষ্ট্রবিজ্ঞানের উৎপত্তির তথা রাষ্ট্রবিজ্ঞানেরও ইতিহাস আছে। শুধু তাই নয় রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিষয়বস্তু ও ক্রমপরিবর্তনেরও ইতিহাস আছে। কিন্তু ইতিহাসের কি রাষ্ট্রবিজ্ঞান আছে? সত্যিকার অর্থে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাস থাকলেও ইতিহাসের কিন্তু কোন রাষ্ট্রবিজ্ঞান নেই। অতএব বলা যায়, ইতিহাসের ভিত সেই সুদূর অতীতে প্রোথিত এবং বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সবকিছুকে কেন্দ্র করে এটি ক্রিমঅগ্রসরমান।

উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায়, ইতিহাসের সাথে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সম্পর্ক বেশ নিবিড়। আর এ নিবিড় সম্পর্কের কারণে একটি ছাড়া অন্যটি পরিপূর্ণ হতে পারে না। যে কারণে ইতিহাসকে একটি গাছের মূল ও কাণ্ডরূপে গণ্য করলে রাষ্ট্রবিজ্ঞানকে ঐ গাছের শাখা-প্রশাখা, ফুল ও ফলের সাথে তুলনা করা যায় ।

আরও পড়ুন:

ইতিহাস পাঠের প্রয়োজনীয়তা

ইতিহাসের বৈশিষ্ট্য সমূহ

Related Posts