Home » বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যা সমূহ আলোচনা কর

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যা সমূহ আলোচনা কর

by Rezaul Karim
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যা সমূহ

শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যা সমূহ

শিক্ষা একটি মানসিক প্রক্রিয়া। সমাজ ও জাতির উৎকর্ষ সাধনে শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। তাই সমাজ জীবনে শিক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্ব অপরিসীম। শিক্ষা ব্যবস্থা সঠিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ হলে সামাজিক সংহতি বিপন্ন হবার সম্ভাবনা থাকে। তবুও শিক্ষা ব্যবস্থার কিছু কিছু সমস্যা পরিলক্ষিত হয়। নিম্নে শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যা সমূহ নিম্নে আলোচনা করা হলো:

১. দারিদ্র্য

বাংলাদেশের মোট জনগোষ্ঠীর একটি বৃহৎ অংশ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। দরিদ্র জনগোষ্ঠী নিজেদের আহারের সংস্থান করতে গিয়ে শিক্ষার সুযোগ লাভ থেকে বঞ্চিত হয়। এসব পরিবারের শিশুরা মা-বাবার সাথে কাজ করতে বাধ্য হয়। দুই এক দিন বিদ্যালয়ে গমন করলেও বাবা-মার চাপে বিদ্যালয় ছাড়তে বাধ্য হয়। অর্থাৎ তাদের বিদ্যালয়ে যাওয়ার মতো সময় এবং সমর্থন লাভে ব্যর্থ হয়। শৈশব পার না করতে শিশুরা আয় উপার্জনমূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করে। শিক্ষার সুফল পেতে স্বভাবতই দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়। ফলে দরিদ্র বাবা-মা শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবনে ব্যর্থ হয়। এভাবে দারিদ্র্য বাংলাদেশে শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে একটি প্রধান বাধা হিসেবে কাজ করে।

বাংলাদেশে শিক্ষার স্তর কয়টি ও কী কী?

২. অবকাঠামোগত সমস্যা

শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য বেশি প্রয়োজন অবকাঠামো। কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ব্যাপারে অনেক সমস্যা বিদ্যমান রয়েছে। পর্যাপ্ত অর্থের অভাবে এবং পরিকল্পনার অভাবে এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সদস্যগণের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রভৃতি বিষয় অবকাঠামোগত উন্নয়নে বাধাগ্রস্ত হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে শিক্ষার পথ আজ বাধার সম্মুখীন হচ্ছে।

৩. সুষ্ঠু শিক্ষানীতির অভাব

শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সুষ্ঠু শিক্ষানীতি। কোন দেশ বা জাতির উন্নতির পূর্বশর্ত হলো ঐ জাতির সুষ্ঠু শিক্ষা ব্যবস্থা। আর এজন্যই প্রত্যেকটি দেশের মান উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা। কিন্তু আমাদের দেশে শিক্ষা ব্যবস্থায় সঠিক নীতিমালা প্রণয়ন করা হয় না। ফলে আমাদের দেশে শিক্ষা ব্যবস্থায় উন্নয়নের দিকে ধাবিত না হয়ে অনুন্নয়নের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

৪. অসচেতনতা

বাংলাদেশে দারিদ্র্যের পাশাপাশি রয়েছে অভিভাবকদের অসচেতনতা। বাবা-মা নিজেদের উদ্যোগে ছেলে-মেয়েদের শিক্ষাসহ সকল বিষয়ে দেখাশুনা করেন, এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু বাবা-মায়ের অসচেতনতার কারণে ছেলে মেয়েরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে না। বাবা-মা যদি শিক্ষার গুরুত্ব অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয় তাহলে শিশুরা শিক্ষার সংস্পর্শ পায় না। এভাবে বাব-মায়ের অসচেতনতার কারণে অনেক শিক্ষার্থী শিক্ষা লাভে ব্যর্থ হয়।

৫. শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি

বাংলাদেশে দ্রব্যসামগ্রীর মূল্য পূর্বের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি বৃদ্ধি পেয়েছে শিক্ষার ব্যয়। শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধির ফলে সাধারণ পরিবারের ছেলে মেয়েরা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে না। শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি অভিভাবকদেরকে তাদের সন্তানদের শিক্ষাগ্রহণের ইতি টানতে বাধ্য হয়।

৬. শিক্ষা উপকরণের অভাব

বাংলাদেশের উপকরণের অভাব লক্ষ করা যায়। বাংলাদেশের প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পুস্তক, আবাসন সুবিধা, অবকাঠামোগত সমস্যা প্রভৃতি অন্যান্য বিষয় শিক্ষা উপকরণের অভাব রয়েছে। শিক্ষা উপকরণের অভাবে ছেলে মেয়েদের শিক্ষাকে নিরুৎসাহিত করে।

সামাজিকীকরণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা আলোচনা কর

৭. বর্ধিত জনসংখ্যার চাপ

বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। এই জনবহুল দেশে জনসংখ্যার অতিরিক্ত বৃদ্ধির কারণই শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম একটি প্রতিবন্ধকতা। অতিরিক্ত জনসংখ্যার ফলে শিক্ষা ব্যবস্থা অর্থাৎ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত দিক থেকে শুরু করে যাবতীয় উপকরণ যোগান দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। আবার বর্ধিত জনসংখ্যাকে শিক্ষা ব্যবস্থার আওতায় আনাও সম্ভব হচ্ছে না বিধায় সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

৮. কৃষির উপর নির্ভরশীলতা

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। শতকরা ৮০ ভাগ লোক কৃষির উপর নির্ভরশীল। আর এই কৃষির উপর নির্ভরশীলতার ফলে গ্রামীণ দরিদ্র জনগোষ্ঠী সন্তানদেরকে স্কুলে পাঠাতে পারে না বিধায় তাদেরকে কৃষিকাজের সাথে জড়িত করে। এভাবেই শিক্ষা ব্যবস্থা ব্যাহত হয়।

৯. শিক্ষায় নারীদের কম অংশগ্রহণ

বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের দারিদ্র্যপীড়িত একটি দেশ। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক নারী হলেও তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চিকিৎসাসহ বিভিন্ন দিক থেকে বৈষম্যের শিকার হয়। শিক্ষাক্ষেত্রে বাংলাদেশের নারীদের বৈষম্যের চিত্র বিভিন্ন তুলে ধরা হয়েছে। যাতে করে নারী শিক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারে। স্বাধীনতার ৪২ বছর অতিক্রম হলেও বাংলাদেশের নারীরা এখনও পিছিয়ে রয়েছে। সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয়সহ নানাবিধ বিষয় নারীদেরকে শিক্ষায় মূলধারায় অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখে।

১০. রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা

বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ হলেও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিদ্যমান। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে শিক্ষা ব্যবস্থা স্বভাবত কারণেই ব্যাহত হতে থাকে। বাস্তবমুখী শিক্ষা গড়ে না উঠার মূল কারণ হলো রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সুনাম ক্ষুণ্ণ হয়েছে। ফলে এসব দেশে শিক্ষাক্ষেত্রে বিশৃঙ্খলা পরিবেশ সৃষ্টি করে।

১১. কারিগরি শিক্ষার অভাব

আমাদের দেশে বাস্তবমুখী শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষার বিশেষভাবে প্রভাব বিস্তার করে। লেখাপড়া শেষ করে যারা সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত তারা অধিকাংশ শিক্ষিত বেকার যুবক। এই বেকারত্বের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য পিতামাতা সন্তানদের বিভিন্ন শিল্প কলকারখানায় কাজে পাঠায় অর্থ উপার্জনের জন্য। এভাবে শিক্ষা ব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

১২. সেশন জট

বিশেষকরে যারা উচ্চ শিক্ষার জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজগুলোতে শিক্ষা লাভ করে আসছে সেখানে সেশন জট একটি মারাত্মক সমস্যা। সেশন জোটের কারণে ছাত্রছাত্রীরা তাদের জীবনের মূল্যবান সময় পার করে দেয়। এমনকি লেখাপড়া করতে না করতেই তাদের চাকরির বয়স সীমা শেষ পর্যায়ে এসে দাঁড়ায়। ফলে তারা হতাশাগ্রস্ত হয়ে দিন কাটায়। এভাবেই শিক্ষা ব্যবস্থায় সেশন জোট একটি মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টি করে।

সামাজিক নিয়ন্ত্রণে শিক্ষার ভূমিকা আলোচনা কর

১৩. শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস

শিক্ষা ব্যবস্থায় অন্যতম সমস্যা হলো শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একদল ছাত্ররা চাঁদাবাজি। টেন্ডারবাজি, রাহাজানি, মারামারি, খুন, দ্বন্দ্ব-সংঘাত ইত্যাদি অপরাধমূলক কাজ শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবেশকে আজ হুমকির সম্মুখীন করে তুলেছে। ফলে দেখা দিচ্ছে শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যা ।

১৪. ছাত্র রাজনীতি

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেজুড় ভিত্তিক দলগুলোর মধ্যে থেকে ছাত্রছাত্রীরা ছাত্র রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করে থাকে। বহিরাগতদের দিয়ে অনেক সময় ছাত্র রাজনীতি পরিচালনা করা হয়। ফলে ছাত্র রাজনীতির ঐতিহ্যের গৌরব হারিয়ে ফেলেছে। ছাত্র রাজনীতির কারণে অনেক সময় দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে, ফলে সেশন জট বেড়ে যায়। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে ছাত্ররাজনীতি বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় সমস্যা।

১৫. ইভটিজিং

বর্তমান সময়ের জন্য একটি আলোচিত ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী বিষয় হলো ইভটিজিং। আর এই ইভটিজিং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বেশি ঘটে থাকে। এতে করে মেয়ে শিক্ষার্থীদের জীবনের কোন নিরাপত্তা না থাকার কারণে অনেক সময় জীবন বিসর্জনের মতো মর্মান্তিক ও বেদনাদায়ক ঘটনা ঘটে থাকে। তাই অভিভাবকরা নিশ্চিত করে মেয়েদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠাতে পারে। ফলে শিক্ষা ব্যবস্থায় একটি বড় প্রতিবন্ধকতা।