Home শিক্ষানৃবিজ্ঞান ব্যক্তিত্বের উপাদান কি কি?

ব্যক্তিত্বের উপাদান কি কি?

by Rezaul Karim
ব্যক্তিত্বের উপাদান কি কি

ব্যক্তিত্বের উপাদান সমূহ

ব্যক্তিত্ব হলো একটি সুসংহত সামগ্রিক সত্তা। এ সত্তা বহুবিধ উপাদানের সমন্বয়ে গঠিত। ব্যক্তিত্ব গঠনে যেসব উপাদান প্রভাব বিস্তার করে সেগুলোকে প্রধানত দু’ভাগে ভাগ করা যায়। নিচে এই দু’প্রকার ব্যক্তিত্বের উপাদান আলোচনা করা হলো-

১. প্রাকৃতিক উপাদান এবং

২. পরিবেশগত উপাদান।

প্রাকৃতিক উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে বংশধারা, দৈহিক গঠন এবং অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি। পরিবেশগত উপাদানগুলোর মধ্যে পরিবার, বিদ্যালয়, দল বা গোষ্ঠী, সংস্কৃতি, জীবন অভিজ্ঞতা ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। নিম্নে এ উপাদানগুলো আলোচনা করা হলো:

১. প্রাকৃতিক উপাদান (Physiological factors)

প্রাকৃতিক উপাদানসমূহ নিম্নে আলোচনা করা হলো:

ক. দৈহিক গঠন (Physical structure): মানুষের দৈহিক গঠনের উপরও ব্যক্তিত্ব বিশেষভাবে নির্ভরশীল। দৈহিক গঠনের জন্য ব্যক্তিত্বের তারতম্য ঘটতে পারে। দীর্ঘকায় ও সুন্দর ব্যক্তি কুৎসিত ও বিকলাঙ্গ ব্যক্তির তুলনায় অধিক সুবিধা ভোগ করে। শারীরিক ত্রুটি মানুষের ব্যক্তিত্ব পরিবর্তন করে ফেলে। যেমন- অন্ধ লোক অন্যের উপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য। গবেষণায় দেখা গেছে গোলগাল চেহারার লোক সাধারণত উল্লাসিত এবং আরামপ্রিয় হয়। ক্ষীণদেহ বিশিষ্ট লোক সাধারণত চঞ্চল প্রকৃতির হয়। সমাজ মনোবিজ্ঞানী ক্রেটসমার (Kretschmer) এবং সেলডন (Seldon) দেহের গঠনের সঙ্গে ব্যক্তিত্বের গভীর সম্পর্ক দেখিয়েছেন। মনোবিজ্ঞানী Adler এর মতে, শারীরিক ত্রুটিযুক্ত ছেলে-মেয়েদের মধ্যে সাধারণত হীনম্মন্যতাবোধ (Inferiority complex) দেখা যায়। সুতরাং দেখা যাচ্ছে দৈহিক গঠনের উপর ব্যক্তিত্ব নির্ভরশীল।

ব্যক্তিত্ব কি বা কাকে বলে? ব্যক্তিত্বের সংজ্ঞা দাও

খ. বংশধারা (Hereditary): ব্যক্তিত্বের উপর ব্যক্তির বংশধারার প্রভাব অনস্বীকার্য। একজন মানুষ বংশানুক্রমে বা উত্তরাধিকার সূত্রে যেসব বৈশিষ্ট্য লাভ করে সেগুলো তার ব্যক্তিত্ব গঠনে প্রভাব বিস্তার করে। মানুষ উত্তরাধিকার সূত্রে তিন রকম বৈশিষ্ট্য পেয়ে থাকে। যেমন-

i. দৈহিক বৈশিষ্ট্য যেমন- দৈহিক উচ্চতা, দেহের রং, মুখ, চোখের গড়ন ইত্যাদি।

ii. মানসিক বৈশিষ্ট্য যেমন- চিন্তা, বুদ্ধি, ইচ্ছা, কল্পনা, মানসিক শক্তি ইত্যাদি।

iii. মনের প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য যেমন- শিশুর মেজাজ (Mood)।

গ. অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি (Endocrine glands): অন্তঃক্ষরা বা নালিকাবিহীন গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হরমোন ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের উপর সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করে। এ গ্রন্থিগুলোর নিঃসৃত হরমোন রক্তের সাথে মিশে শরীরের বিভিন্ন অংশে ছড়িয়ে পড়ে। যে সকল অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি ব্যক্তিত্বের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত সেগুলো হলো পিটুইটারী গ্রন্থি (Pituitary glands), থাইরয়েড গ্রন্থি (Thyroid glands), এড্রিনাল গ্রন্থি (Adrenal glands) এবং যৌন গ্রন্থি (Sex glands)। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, অনাল গ্রন্থি বেশি পরিমাণে সক্রিয় হলে ব্যক্তি চঞ্চল ও অস্থির চিত্তের হয়ে থাকে। আবার প্যানেক্রিয়াস (Pancreas) গ্রন্থি থেকে নির্গত ইনসুলিনের (Insulin) পরিমাণ অনুযায়ী রক্তে শর্করার পরিমাণেরও তারতম্য হয়ে থাকে। একটি সংকটময় (Critical) স্তরের নিচে রক্তে শর্করার পরিমাণ নেমে আসলে ব্যক্তি অতি সহজে বিরক্ত হয় এবং তার মধ্যে অস্পষ্ট ভীতির সঞ্চার হয়। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি ব্যক্তিত্বের উপর প্রত্যক্ষভাবে প্রভাব বিস্তার করে থাকে।

২. পরিবেশগত উপাদান (Environmental factors)

পরিবেশগত উপাদান দুই প্রকারের হয়ে থাকে। যথা:

ক. প্রাকৃতিক পরিবেশ (Physical environment),

খ. সামাজিক পরিবেশ (Social environment)।

ক. প্রাকৃতিক পরিবেশ (Physical environment): প্রাকৃতিক পরিবেশ ব্যক্তির মনের উপর গভীর প্রভাব বিস্তার করে। প্রাকৃতিক পরিবেশের বিভিন্ন উপাদান যেমন- জলবায়ু, মাটি, গাছপালা, জীবজন্তু, খাদ্য প্রভৃতি ব্যক্তিত্ব গঠনে অবদান রাখে। এগুলোর প্রভাবে ব্যক্তি হয় কর্মঠ বা অলস, শক্তিমান বা দুর্বল, পরিশ্রমী বা কুঁড়ে প্রকৃতির।

খ. সামাজিক পরিবেশ (Social environment): প্রাকৃতিক পরিবেশের পাশাপাশি সামাজিক পরিবেশও মানুষের ব্যক্তিত্বকে প্রভাবিত করে। অনুকূল সামাজিক পরিবেশে ব্যক্তির সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত হয়, আর প্রতিকূল হলে বিপরীত হয়। নিম্নে সামাজিক পরিবেশের উপাদানগুলো বর্ণনা করা হলো:

i. পরিবার (Family): সামাজিক পরিবেশের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও উল্লেখযোগ্য হলো গৃহ বা পরিবারের পরিবেশ। পরিবারের সুস্থ ও মনোরম পরিবেশ শিশুর ব্যক্তিত্ব গঠনে বিশেষভাবে উপযোগী। পরিবারের পিতা-মাতা, ভাই-বোন ও অন্যান্য আত্মীয়-পরিজনদের কার্যকলাপ, চিন্তাধারা ও আদর্শ শিশুর ব্যক্তিত্বের উপর গভীর প্রভাব বিস্তার করে। পিতা-মাতা যদি শিশুকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দেন, তাহলে শিশুর মধ্যে আত্মনির্ভরতা, আত্মবিশ্বাস, সাহস, স্বাধীনভাবে কর্ম ও চিন্তা করার ক্ষমতা দেখা দেয়। এর ফলে শিশু স্থির ব্যক্তিত্ব অর্জন করে। পক্ষান্তরে, পিতা- মাতা যদি শিশুর প্রতি নির্মম ব্যবহার করেন, তাহলে শিশু বিদ্রোহী মনোভাবাপন্ন, অসংযত, ভীরু, অসামাজিক ও রুক্ষ মেজাজের হয়ে থাকে। কাজেই পরিবারের পরিবেশ যত মনোরম, যত স্বাস্থ্যকর, যত স্নেহপূর্ণ হবে, পরিবারের ছেলে-মেয়েরা সেভাবেই ব্যক্তিত্ব অর্জন করবে।

ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য গুলো কি কি?

ii. বিদ্যালয় (School): ব্যক্তিত্ব গঠন ও বিকাশে পরিবারের পরই বিদ্যালয়ের স্থান। এখানে শিশু শিক্ষক-শিক্ষিকা ও বিভিন্ন সহপাঠীদের সংস্পর্শে আসে। শিক্ষকদের সদয় ও স্নেহপূর্ণ ব্যবহার, শিক্ষা দেয়ার আগ্রহ, তাঁদের আচার- ব্যবহার, কথা-বার্তা, চালচলন ইত্যাদি শিশুর জীবনের উপর বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে। অপরপক্ষে, শিক্ষকের কঠোর ব্যবহার, নির্মমতা শিশুমনকে বিদ্রোহী করে তোলে, তার মধ্যে উদাসীন ভাব সৃষ্টি করে। সহপাঠীদের সাহচর্যে শিশু তার সুপ্ত ক্ষমতা ও শক্তির স্বাধীন বিকাশ সাধনে সচেষ্ট হয়। সুতরাং শিশুর ব্যক্তিত্ব গঠন ও বিকাশের মূলে বিদ্যালয়ের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

iii. দল (Group): ব্যক্তিত্ব গঠনে দলের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্যালয় থেকেই ব্যক্তি বিভিন্ন দলের সদস্য হয়ে থাকে। যেমন- বিদ্যালয়ের সহপাঠী, খেলার সাথী, ক্লাবের বন্ধু, প্রতিষ্ঠানের সহকর্মী প্রমুখের সমন্বয়ে দলের সৃষ্টি হয়। প্রতিটি দলেরই নিজস্ব একটি মান বা আদর্শ থাকে। দলের আদর্শ, কার্যপ্রণালি ইত্যাদি দলের সদস্য হিসেবে একজন ব্যক্তির ব্যক্তিত্বের উপর প্রভাব বিস্তার করে।

iv. সংস্কৃতি (Culture): নৃবিজ্ঞানীদের মতে, ব্যক্তিত্ব গঠনে সংস্কৃতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মনোবিজ্ঞানী নাইট এবং নাইট ব্যক্তিত্ব গঠনে সংস্কৃতির ছাঁচের (Cultural pattern) উপর গুরুত্বারোপ করেছেন। অর্থাৎ ব্যক্তি যে সম্প্রদায়ের মধ্যে বড় হয় সেই সম্প্রদায়ের মূল্য (Values), প্রত্যাশা, আচার- আচরণ, রীতিনীতি, ঐতিহ্য প্রভৃতির প্রভাবে তার ব্যক্তিত্বের সাধারণ রূপরেখা ফুটে উঠে। বংশগতিতে মানুষ ব্যক্তিত্বের কতকগুলো মৌলিক উপাদান লাভ করে। আর সংস্কৃতি হতে সে একটি নির্দিষ্ট ছাঁচ পায়, যে ছাঁচে সে ঐ সকল মৌলিক উপাদানগুলোকে ঢেলে সাজায়। এর ফলে ব্যক্তির মধ্যে একটি নির্দিষ্ট ধরনের ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটে।

v. জীবন অভিজ্ঞতা (Life experience): প্রতিটি মানুষের জীবন বিচিত্র ঘটনা এবং অভিজ্ঞতায় ভরপুর। এসব ঘটনা এবং অভিজ্ঞতা তার ব্যক্তিত্বের নির্ধারক। জীবন অভিজ্ঞতা মানুষকে বলিষ্ঠ অথবা দুর্বল ব্যক্তিত্বের অধিকারী করে তোলে।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে, ব্যক্তির ব্যক্তিত্ব গঠনে দৈহিক, সামাজিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশ যুগপৎ প্রভাব বিস্তার করে। ব্যক্তি যদিও নির্দিষ্ট পরিবারে জন্মগ্রহণ করে তবুও প্রাকৃতিক ও সামাজিক পরিবেশের মাঝে নিজেকে খাপ-খাওয়ানোর চেষ্টা করে। এই খাপ-খাওয়ানোর প্রক্রিয়ায় যে সফলতা বা ব্যর্থতা সৃষ্টি হয় তার কারণে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে বা সামাজিক অবস্থায় প্রতিপালিত হয়ে একই ব্যক্তি বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের অধিকারী হয়। মনোবিজ্ঞানী G. W. Allport এর ভাষায়, “The same fire that melts the butter hardens the egg.” অর্থাৎ, একই আগুনের উপর দিলে মাখন গলে যায়, কিন্তু ডিম শক্ত হয়।

উপরের আলোচনা থেকে আপনারা ব্যক্তিত্বের উপাদান সমূহ সম্পর্কে জানতে পারলেন।

Related Posts